ঢাকা , সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ , ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেকনো ড্রাগসের প্রধান কারখানা নিলামে

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৫-১০-২০২৬ ০৬:২৪:২১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৫-১০-২০২৬ ০৬:২৪:২১ অপরাহ্ন
টেকনো ড্রাগসের প্রধান কারখানা নিলামে



ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেকনো ড্রাগস পিএলসির গাজীপুরের প্রধান কারখানা, জমি ও যন্ত্রপাতি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে ওয়ান ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির নিলাম বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ছিল ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৯৭২ টাকা। এর সঙ্গে আদায়কালীন অনারোপিত সুদ ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হবে।

ওয়ান ব্যাংক গত ১৩ সেপ্টেম্বর নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আগ্রহী ক্রেতাদের কাছ থেকে সিলমোহর করা দরপত্র আহ্বান করেছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আজ সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়া যাবে। একই দিন দরদাতাদের উপস্থিতিতে দরপত্র খোলা হবে।

ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের জন্য টেকনো ড্রাগসকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পরিশোধ করেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি ঋণগ্রহীতায় পরিণত হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বরের বন্ধকী দলিলের মাধ্যমে টেকনো ড্রাগসের সম্পত্তি ওয়ান ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা হয়। একই দিনে করা আম-মোক্তারনামার মাধ্যমে ওই সম্পত্তি বিক্রি ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা ব্যাংককে দেওয়া হয়। নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে তফসিলভুক্ত জমি ও স্থাপনার পাশাপাশি কারখানায় থাকা বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন, প্যাকেজিং ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিও বিক্রির আওতায় রাখা হয়েছে। ‘যেখানে যে অবস্থায় আছে’ ভিত্তিতে এসব সম্পত্তি বিক্রি করা হবে।


সম্ভাব্য ক্রেতাদের দরপত্র দেওয়ার আগে কারখানা ও যন্ত্রপাতি সরেজমিন পরিদর্শন ও যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ব্যাংক। পরে সম্পত্তি নিয়ে কোনো দাবি, আপত্তি বা অভিযোগ গ্রহণ করা হবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেসব যন্ত্রপাতি নিলামে

নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে কারখানায় থাকা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির তালিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অটোমেটিক ভায়াল ফিলিং ও রাবার স্টপারিং মেশিন, অটোমেটিক ভায়াল সিলিং মেশিন, বোতল ওয়াশিং মেশিন, প্যাকিং মেশিন, স্যাম্পলিং বুথ, ডাস্ট এক্সট্রাক্টর, ক্যাপ সিলিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম পাম্প, স্টেরিলাইজেশন চেম্বার, ট্রে ড্রায়ার, অটোমেটিক ক্যাপিং মেশিন, সেলফ-অ্যাডহেসিভ লেবেলিং মেশিন, ট্যাবলেট কোটিং মেশিন ও মেটাল ডিটেক্টর। এ ছাড়া পেনিসিলিন ভবন, কুলিং প্ল্যাটফর্ম, এয়ার শাওয়ার, রেফ্রিজারেটর, ইলেকট্রনিক ব্যালান্স, পাউডার ফিলিং মেশিন, ড্রেস ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও সরঞ্জামও নিলামের আওতায় রাখা হয়েছে।

দরপত্রের সঙ্গে জামানত

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দর হলে ২০ শতাংশ, ১০ লাখের বেশি থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত দর হলে ১৫ শতাংশ এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি দর হলে ১০ শতাংশ জামানত দিতে হবে। ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে এই জামানত জমা দিতে হবে।

সর্বোচ্চ দরদাতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে হবে। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দর হলে ৩০ দিনের মধ্যে, ১০ লাখের বেশি থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে ৬০ দিনের মধ্যে এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ৯০ দিনের মধ্যে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে সম্পত্তি কেনার সুযোগ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

নিলামকৃত সম্পত্তির ওপর সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, তিতাস গ্যাস, ভূমি উন্নয়ন করসহ সরকারি, আধাসরকারি বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কোনো বকেয়া থাকলে তা ক্রেতাকেই পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর, সম্পত্তির নিবন্ধন, ট্যাক্স ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও সফল দরদাতাকে বহন করতে হবে। ব্যাংক জানিয়েছে, প্রস্তাবিত দর অস্বাভাবিকভাবে কম বা অপর্যাপ্ত মনে হলে কোনো দরপত্র গ্রহণ না করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর ব্যবসায় চাপ

টেকনো ড্রাগস ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রতিটি শেয়ারের কাট-অব মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৪ টাকা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৪ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, টেকনো ড্রাগস সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ, ইনজেকশন, হরমোন এবং বিশেষায়িত ক্যান্সারবিরোধী (অনকোলজি) ওষুধ উৎপাদন করে। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক চাপের মধ্যে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মুনাফার নির্ধারিত অংশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ না করা এবং আয়কর আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের অস্বীকার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

টেকনো ড্রাগস সম্প্রতি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সরবরাহের ৯৬ কোটি টাকার একটি দরপত্রে আবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা নিলামে বিক্রি হলে ভবিষ্যতে ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। 

অভিযোগ ও নিলাম বিষয়ে টেকনো ড্রাগসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ জালাল উদ্দিন আহমেদের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

টেকনো ড্রাগসের পরিচালক আরেফিন রাফি আহমেদ বলেন, নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে গাজীপুরের একটি ওষুধ উৎপাদন কারখানা ও জমি ব্যাংক নিলামে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘এতে আমাদের ওষুধ উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। শেয়ারের দাম কিছুটা কমতে পারে।’

টেকনো ড্রাগসের পক্ষে ঋণের দায়ের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ জালাল উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান খালেদা আখতার খান এবং পরিচালক মেহরীন আহমেদ, আরেফিন রাফি আহমেদ ও মো. মামুনুর রশিদকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ